সুতা ছেঁড়া স্বপ্ন ঘুড়ি | সম্পা রায়

সুতা ছেঁড়া স্বপ্ন ঘুড়ি | সম্পা রায়
ধাপগাছের আকাশে সূর্য ওঠেনি। কেবল আলোর আভাস দেখা দিয়েছে। লিচুতলা মসজিদ হতে আজানের আওয়াজ মিলিয়েছে কিছুক্ষণ আগে। রাতশেষের বার্লিটা গরম করে মেয়েটাকে খাইয়ে দিয়ে নূরী দরজার খিলটা খুলল। শেষবার দেখে নিল মেয়েটাকে। তারপর এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে গেল সিদ্দিক কাকার আলুক্ষেতের দিকে। দক্ষিণ আলের পুব মাথার আলগা মাটিগুলো সরিয়ে বের করে আনল ব্যবহারের পর পুতে রাখা খালি কীটনাশকের বোতলগুলো। কৌটার মুখ খুলে বিষের শেষ বিন্দু পর্যন্ত ঢেলে জমা করল একটাতে। দেখার চেষ্টা করল কতটুকু জমেছে। মরার মত বিষ হবে তো? হায়রে জীবন! বাঁচার মত বিষ বস্তু মেলেনা, জোটেনা মরার বিষও। মৃত্যুর কথা মনে পড়তেই মেয়েটার মুখটা ভেসে উঠল বোতলের তলায় পরে থাকা বিষটুকুর মধ্যে। মায়াভরা মুখে তাকিয়ে আছে। দুধ নয়, ভাত নয়, শুধু কাছে চায়। হঠাৎ মনে হয় কাঁদছে মেয়েটা। বোতলগুলো ফেলে উন্মাদের মত ছুটে আসে নূরী। খোলা দরজাটার কাছে এসে দেখে তখনো ঘুমে মেয়েটা। কাছে যায়। ডুকরে কেঁদে ওঠে। প্রচণ্ড বাঁচতে ইচ্ছে করে। মেয়েটাকে এভাবে রেখে মরতে পরবে না ও। ঘুমন্ত মেয়েকে কোলে তুলে নেয় নূরী। বাড়ন্ত সীম লতার মত জড়িয়ে যায় মেয়েটা ওর দেহের সাথে। কার কাছে থাকবে মেয়েটা? ছুরত আলী ওকে দিয়ে যা করাতে চাইছে, মেয়েটাকে দিয়েও কি..? ভাবতে পারেনা নূরী।

পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা নূরী বেগম স্বামী ছুরতের কাছ থেকে কি কারণে পালিয়ে এসেছিল ধাপগাছের লোকেরা তা জানেনা। কাউকে বলতেও পারবেনা নূরী। লজ্জা, ঘৃণা আর ক্ষোভের আগুনে দগ্ধ হয়েছে। কাউকে বলেনি, এমনকি ওর মাকেও বলেনি। ভালবেসে বিয়ে করেছিল নুরী ছুরৎ আলীকে। কিন্তু পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল সে। নিত্য অভাবী মায়ের কাছে আসতে ভীষণ খারাপ লেগেছিল ওর। কিন্তু সম্মান বাঁচাতে পেরেছিল। তাছাড়া শরীরের এ অবস্থায় মায়ের কাছে থাকতে পেরে বেশ খুশী ছিল।

জন্মালো পরী। ফুটফুটে ছোট্ট পরীকে দেখে নূরীর মা দিয়েছিল এ নাম। পর্যাপ্ত বুকের দুধ ছিলনা। তাই একটু বার্লি আর বিচি কলা ঘষে খাওয়াতে শুরু করলো নূরী। এভাবে বড় হতে থাকল নূরীর সাত রাজার ধন। পরী বোল ধরেছে। দা..দা, বা..বা..। রাগে জ্বলে যায় নূরী। বাবা শব্দটা সে শেখাতে চায়না। বাবা শব্দটার উপর দারুণ ক্ষোভ আর অভিমান ওর। ছোটবেলায় নূরীর বাবা ওর মাকে তালাক দিয়েছিল। তখন নূরীর বয়স ৪/৫ হবে। আজ পরীর বয়স এক বছর হল। মাঘ মাসের ২৪ তারিখ জন্মেছিল পরী। ক্ষুধায়, ঠাণ্ডায় আর ব্যাথায় কাহিল ছিল নূরী সেদিন। সারা রাতের প্রচণ্ড চেষ্টায় সকাল বেলা জন্ম দিয়েছিল পরীকে। প্রবল আবেগ জড়িয়ে ধরে পরীকে।

উঠোনে কার পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঐতো শকুনেরা ফিরেছে। আদম সুরৎ, বাহার আলী, নিজাম উদ্দিন আর বাকীউল্লাহ। ছুরৎ আর ওর ঢাকাইয়া দোস্ত। যাদের কাছে টাকা ধার করে হাউজি খেলেছে ছুরৎ। আর ধারের বদলে নূরীকে..। দুচোখে পানি জমে, দু'গাল বেয়ে টপটপ গড়িয়ে পরে পরীর মুখের উপর। একদিন ঢাকাকে ভয় পেয়ে পালিয়ে এসেছিল নূরী। আজ ঢাকা উঠে এসেছে ওর চালার উপর। নূরীর মায়ের মৃত্যুর খবর শুনেই এসেছে পিশাচটা, ওর সাঙ্গ পাঙ্গসহ। সাপের গায়ের মত চিকন ঠাণ্ডা ব্যথা ক্ষোভ দানা বাঁধে নূরীর মনে, আর অশ্রু হয়ে গড়িয়ে যায়। হয় মরে যাও নয়ত কাঁদতে থাক। এছাড়া কিছু করার নাই নূরীর। ‍‍‍‍‍‍‍কাকো কিছু কয়া দিলে, পরীক শেষ করি দেইম। ছুরতের এ কথাটা নূরীর মুখে কুলুপ এঁটে দিয়েছে। পরীর বুকে থুথু ছিটায় নূরী। জোড় করে অমঙ্গলের ছায়াটাকে সরাতে চায়। ছুরৎ নূরীকে ডাকছে। নূরী শোন, খেইজরের অস অাননু। মোর দোস্তর ঘরক ক্ষীর আন্দি খোয়াও ক্যানে। কি স্বাভাবিক সে স্বর। মনে হয় কত সুখের ঘরকণ্যা করে ছুরৎ আলী। বন্ধুদের জন্যে ক্ষীর! আচ্ছা ক্ষীরের সাথে যদি বিষগুলো মিশি দেওয়া যায়। চোখ মুছে উঠে দাঁড়ায় নূরী। শকুনের চারজোড়া চোখ ছিড়ে-ছিড়ে খায় এর বাড়ন্ত যৌবন। দুটো গোবরের শলায় আগুন দিয়ে রসটা চুলায় চাপায়। তারপর আলুক্ষেতের আলপথ ধরে। যাতে কেউ সন্দেহ না করে তাই শাকের ঝাকাটা নেয়।

কয়মুঠি আলুশাকের নিচে জড়ো করা বিষের বোতলটা লুকিয়ে আনে। কোচরে লুকিয়ে রেখে হাড়ির রসে চাল মেলায়, প্যাকেটের দুধ মেলায়, বিষ.. না বিষটা মেলাতে পারেনা। মানুষ মারি জেল ফাঁসি হইলে পরীর কি হইবে? যদিও এদেরকে মানুষ বলে মনে করেনা নূরী। মানুষের রূপে শয়তান এরা। স্তুপীকৃত শুকনা পাতার নিচে ঢুকিয়ে দেয় বিষের বোতলটা। পায়েসের হাড়িটা দাওয়ার আনে স্টিলের প্লেটের ওপর সোনারোদ চমকায়। নূরীর মনে জ্বলে যন্ত্রণার আগুন। মুড়ির সাথে ক্ষীর খেয়ে বেড়িয়ে যায় ওরা। বলে যায় দুপুরে আসবেনা। নূরী দাওয়ায় বসে ভাবতে থাকে। ভাবনা মানেই কাঁদা। সৃষ্টিকতাকে বলে, উয়ার (ছুরতের) মরণ নাহয় ক্যানে? ভাবতে ভাবতে একটু চোখ ধরছিল। সিদ্দিক বাড়ির বড় মেয়ে সিরাতের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে ওর। ধরফর করে উঠে বসে। পরী বিছানা ভিজিয়েছে। সিরাত ঢাকা থেকে নিয়ে আসা জিনিসগুলো দেখতে এসেছে।

ছুরৎ এ গ্রামের সবার কাছে গল্প করেছে যে এবার থেকে যাবে। তাই সব কিছু নিয়ে এসেছে। আসলেই অনেক কিছু এনেছে ছুরত। একটা কালোসাদা ডোরাকাটা ব্যাগে একটা লাল ডুড়ে শাড়ি, ছায়া, আলতা, সুরমা, ভ্যালভ্যাটের ব্লাউজ, চকচকে লাল একজোড়া হাইহিল জুতা। যা এখনও ছুঁয়েও দেখেনি নূরী। সিরাত অনুমতির তোয়াক্কা না করেই ডোড়া ব্যাগটার জিপার খুলে সব বের করতে থাকে। জিনিসগুলো পড়তে চায় সিরাত। মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় নূরী। ব্যাথায় টনটন করে মাথাটা। গলাটায়ও প্রচণ্ড ব্যাথা। রাতে টিপে ধরেছিল গলাটা। তারপর বন্ধুদের ডাকে বাইরে গেলে ঘরের দরজাটা লাগিয়ে দিয়েছিল ও। বেড়া কাটার হুমকি দিলে চিৎকার করার পাল্টা হুমকিতে কাজ হয়েছিল। রণে ভঙ্গ দিয়ে তারপর সারারাত তাস খেলেছিল ওরা দাওয়ায় বসে। বন্ধুদের শয্যা সঙ্গীনী করার জন্য নরমে নরমে অনেক চেষ্টা করেছে ছুরৎ। আজতো বেঁচেছো, কাল কি বাঁচবে? পরীকে কোলে তুলে একটু ক্ষীর খাওয়াতে শুরু করে নূরী। ততক্ষণে ফ্রকের উপরে শাড়িখানা জড়িয়ে হিলটা পায়ে দিয়ে নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে সিরাত। হঠাৎ মাকে দেখাবে বলে ছুটতে থাকে। নূরী চিৎকার করে বলে, “থামো বাহে মুইও তোমার বাড়ি যাইম।” বাচ্চাটার খাওয়া হলে কোলে তুলে দরজার শিকল তুলে দিয়ে সিদ্দিক বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। পথে ছুরতের সাথে দেখা হয়। ছুরৎ একটা অদ্ভুত অবিশ্বাস কিন্তু শান্তিময় খবর দেয়। ছুরৎরা নাকি চলে যাচ্ছে। ছুরৎ আলী অভিমানের সাথে বলে, “মুইতো তোর সাথে থাকি যাবার জন্যে আসছিনু। মোর কথাতো শুনলুনা। ওমাক বিদায় করবার পারলে..। যাউক মোর কথাতো শুনলুনা এলা ঢাকা যায়া ওমারগুলার টাকাটা শোধ দেওয়া নাগবে। আইজ নাইট কোচোত ঢাকা যাম হামরা।”

আর সিদ্দিক বাড়ি যাওয়া হয়না নূরীর। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করে যে ওরা চলে যাচ্ছে। ভেবে ভাল লাগে। কিন্তু স্বস্তি পায় না। রাখালছেলেদের উড়িয়ে দেয়া একটা চংগুড্ডি ‘বো- বো’ শব্দ তুলেছে। শব্দটা নূরীর অস্বস্তি বাড়িয়ে তুলছে। তবুও একটু মুক্তির স্বাদ অনুভব করতে চায়। ফিরে এসে ক্ষীর খাওয়া এঁটো বাসন তোলে। দাওয়ায় পাতা খড়ের বিছানাটা তোলে। পরীর ভেজানো কাঁথাগুলো নিয়ে তিস্তার শাখা খালটার দিকে যায়। পরীকে পাড়ে বসিয়ে রেখে কাপর কাচে, গোসল করে। বাড়ি ফিরে ব্যাথার যায়গাগুলোতে হেকমত আলীর ‘কাচি কাটা বাম’ লাগায়। দুটা মুড়ি খেয়ে একগ্লাস পানি যখন খায় তখন আসরের আজান দিয়েছে। ঘুড্ডিটার অস্বস্তিকর শব্দটা তখনও চলছে।

সন্ধ্যায় চলে যেতে চেয়েছে ওরা। আরও আগে বিদায় করতে পারলে খুশী হয় নূরী। তাই তাড়াতাড়ি চুলায় আগুন দিয়ে হাড়িটা চাপায়। চাল ধুয়ে দিয়ে ভাবতে থাকে কি রান্না করবে। এমন সময় হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে ফেরে ছুরৎ। গোশত, আলু, মরিচ, মশলা। আশুমুক্তির আনন্দে খুব তাড়াতাড়ি রান্না করে খাওয়ায় ওদের। তৃপ্তির ঢেকুর তোলে ওরা। সিদ্দিক বাড়িতে দীর্ঘদিন রান্নার কাজ করে নূরী। রান্নাটা ওখানেই শিখেছে ও। গোশতের হাড়িতে ভাত নিয়ে সে নিজেও খেতে বসে। পারে না। মুরগীর খোয়ারে হাড়িটা ঢুকিয়ে দেয়। রান্নার হাড়িকুড়ি গুছিয়ে পরীর জন্য বার্লিটা গরম করে খাওয়াতে এসে দেখে সিরাতের এলোমেলো করে যাওয়া কাপড় চোপড় গুলো গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে ছুরৎ। তারপর কালী সন্ধ্যার অন্ধকারে অদৃশ্য হয় চারজন। কিন্তু স্বস্তি পায়না নূরী। একটা অজানা ভয়, অজানা আতঙ্ক, একটা আশংকার ঘন কুয়াশা ঘিরে থাকে নুরীর হৃদয়কে। বাইরেও খুব ঘন কুয়াশা পড়েছে। কুয়াশার চাদরে আঁধারে কারুকাজ। বাতাসের ফিসফিসানিকে পিশাচের নিঃশ্বাসের মত মনে হচ্ছে। আজকে ঘুমাতে চায়না নূরী। কেরোসিনের বাতিটা তুলে দেখে নেয়, দরজার খিলটা দেয়া হয়েছে কিনা। একটা বাঁশের টুকরা দিয়ে ঠেকা দেয় দরজাটা। বাতিটার উজ্জলতা বাড়িয়ে দিয়ে পরীর পাশে বসে নূরী। না আজ ঘুমাবেনা নূরী। মনটা কেমন যেন খচখচ করছে। মার কথা খুব মনে পরছে নূরীর। মা না থাকাতে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। কত রাত দু’মায়ে মেয়েতে কত গল্প করেছে। পরীকে নিয়ে নূরী কত উড়িয়েছে স্বপ্নের রঙ্গিন ঘুড়ি। সে সব স্বপ্ন কি পুরণ হবে? ভাবতে ভাবতে দুচোখের পাতা ভারী হয়ে উঠে। ঘুম ঘুম পায়। নড়েচড়ে বসে নূরী কিন্তু পারেনা। ক্লান্ত, অবসন্ন, ক্ষুধা ক্লিষ্ট, ভাগ্যতাড়িত অবসন্ন নুরী একটু পরেই ঘুমিয়ে পরে।

ঘুমিয়ে অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখে ও। সুন্দর চনমনে রৌদ্রজ্জ্বল দিন। সিদ্দিক কাকার বাড়িতে কাজে যোগ দিয়েছে নূরী। পরী সিরাতের ছোটবোন সিয়ামের সাথে ধাপগাছ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। স্কুলে নতুন আপা বটগাছটার নিচে ওদের পড়াচ্ছে স্বর.. অ.. স্বর.. আ। একি আপা কোথায়? এযে পরী! দিনের বেলা যে গুড্ডিটার শব্দে কাতর ছিল নূরী সেই গুড্ডিটাই কোথা থেকে এসে পরীকে তুলে নিয়ে হাসতে হাসতে ভাসতে থাকল। নূরীও হাসে। হঠাৎ তিস্তার আউলা বাতাসে পাক খায় গুড্ডিটা। পরে যাচ্ছে পরী। পরী..ই..ই। চিঃকার করে ডাকতে চায় পরীকে। পারেনা। দু’হাত বাড়িয়ে ধরতে চায় মেয়েকে। পারেনা। অসীম শূন্যতা চারদিকে। শূন্যতা গ্রাস করে নূরীর হৃদয়, মাঘের কুয়াশা ঘেরা গমের ক্ষেত, বিস্তীর্ণ আলুর ক্ষেত, তিস্তার শাখা খালটার তীর ঘেষে কচিঘাসের পতিত জমিগুলো ছুয়ে শূন্যতাটা বিস্তৃত হল অনেক দূর।

অতঃপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই শিশির শিক্ত গমের কচি থোরের বিছানায় ব্যবচ্ছেদ হল নূরীর অহংকার, সম্ভ্রম, স্বপ্ন। একটুও লাগেনি নূরীর শরীরে। চোখের সামনে সুতা ছেড়া চংঘুড্ডিটা প্রচণ্ড বেগে পাক খেতে খেতে ঘুরতে থাকে। ঘুরতে থাকে পরী। তখনও দুহাত বাড়িয়ে মেয়েকে ধরতে চায়। পারেনা। দুটো কঠিন হাত নূরীর দুর্বল হাত দুটোকে গমের ক্ষেতের সাথে ঠেসে ধরে থাকে। হঠাৎ ঘুড়িটা আর দেখতে পায়না ও। একটা কঠিন লোমশ হাত চেপে বসে যায় ওর কণ্ঠনালীতে। ধাপগাছের বাতাস কত মধুর এই প্রথম ও শেষবারের মতো বুঝতে পারে নূর-ই-জান্নাতি।

তারপর শাখা খালটার বালুচরের ওপর হতে অন্ধকার মিলিয়ে যাবার আগেই ওর বুকে ঠাঁই পেল নূরী- একতাল মাংস পিণ্ড। সাথে একটা ডোড়া কাটা কাপড়ের ব্যাগ। যাতে ছিল লাল ডুরে শাড়ি, ভেলভেটের লাল ব্লাউজ, আলতা, সুরমা, একজোড়া লাল হাইহিল। অবশ্য ছুরতের জুতাজোড়াও রয়ে গেল ওর সাথে।

সকালের সূর্যটা আলো ছড়াতে শুরু না করতেই প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে এক কাহিনী আবিষ্কার করল। যার সারমর্ম নূরী ছুরতের দোস্তদের সাথে পালিয়েছে। দাওয়ার এককোণে ছুরতের কোলে অবিরত কাঁদছিল পরী। ছুরতের চোখ ফোলা, মাথাটা ছিল মাটির দিকে। সমবেতদের মধ্যে পরীর জন্যে মমতা উঠল। পরীর দেখাশুনার জন্যেই যে ছুরতের একটা বিয়া করা প্রয়োজন তাও জানাল সবাই। এমনকি ধাপগাছ-রতনপুর-নয়ার বাজারের যত সোমত্ত মেয়ে আছে সবার সাথে জোড়া মেলানোও শুরু হয়ে গেল। এক ফাঁকে সিরাত এসে পরীকে এসে নিয়ে গেল ওদের বাড়ি। পরিচিত পরিবেশ আর সিয়ামকে পেয়ে পরী একটু শান্ত হয়ে খুঁজতে শুরু করল ও। মাকে কোনদিন পাবে না তাতো জানেনা কচি মেয়েটা।

অতঃপর নূরী নামের এক ডাইনীর অবৈধ প্রেম ও পলায়ন কাহিনী পত্র-পল্লবে-শাখায় বিকশিত হল। বিশাল এক ধাপগাছ হয়ে ধাপগাছ-রতনপুর-পাওটানার মাঠে, ঘাঠে, বাজারে, মসজিদে, স্কুলে, মাদ্রাসায়, মেয়েদের অলস আড্ডায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল। আলোচনার মন্তব্যে অবশেষে নূরীর আশ্রয় হল দোজখতুল্য নিষিদ্ধ পল্লীর কোন ঘরে। ছুরৎ ছাড়া ধাপগাছের আর কেউ জানলোনা বাড়ি থেকে মাত্র আধা মাইল দূরে, একটা বস্তায় বড়-কষ্টে আছে নূরী। মাথার উপর বিস্তীর্ণ আকাশ, বুকে বিস্তৃত বালুরাশি। সে বালুর উপর খেলা করে আগুন সূর্য। রাতে গোড় খোদকেরা হেটে বেড়ায় নূরীর মাথার ওপর দিয়ে।

পরীর কি হল? সে গল্প অন্যদিন। তবে বাবা নামের মানেটা ওর কাছে অন্যরকম ছিল। আর রাতজাগা পাখির মত রাতটা জীবন্ত হয়ে দিনগুলো ছুটি নিয়েছিল পরীর জীবন হতে।

0 comments: